1. admin@badalphoto.com : admin : Camellia Open Sky School

চায়ের কৃষিতাত্ত্বিক দিক

চা চাষাবাদ কৌশল

বাংলাদেশে চা চাষের আওতাধীন জমির বেশিরভাগই টিলা (প্রায় ৬০%)। এছাড়া কিছু চা আবাদি জমি রয়েছে যা উঁচু কিন্তু সমতল। দেশের উত্তরের চা উৎপাদনকারী জেলাগুলো যেমন- পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, দিনাজপুর ও লালমনিরহাটে সমতলভূমিতে চা চাষ হচ্ছে।

জমি প্রস্তুতি ও রোপণ পরিকল্পনা: বাংলাদেশে চায়ের আবাদযোগ্য শতকরা ৫৫ থেকে ৬০ ভাগই টিলা। টিলা বা পাহাড়ী জমিতে কন্টুর পদ্ধতিতে চায়ের চাষ করা হয়। টিলা জমিতে মাটি বেশি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, তাই সেখানে কন্টুর (contour) পদ্ধতিতে চা চাষ করা হয়। প্রথমে ঐ স্থানটি ভালোভাবে পরিষ্কার করে, গর্ত থাকলে তা সমান করে অতঃপর কন্টুর পদ্ধতির জন্য লাইন এবং পথ তৈরি করতে হবে। টিলাতে ৬ থেকে ১৮ মিটার দূরে দূরে কন্টুর পথ তৈরি করা প্রয়োজন। কন্টুর পথই সেখানে পানি নিষ্কাশনের নালা হিসাবে কাজ করে। কন্টুর নালার গভীরতা ৪৫ সে.মি. ও প্রস্থ ৩০ সে.মি. হিসেবে ধরে টিলার ভিতরের দিকে সামান্য ঢালু করে কাটতে হয়।

সমতল ভূমিতে চা চাষের জন্য সেখানে প্রথমে হালকা চাষ অতঃপর মই দিয়ে মাটি সমান করতে হয় এবং আগাছা বাছাই করে নিয়ে স্থানটি পরিষ্কার করতে হয়। জমি সমতল হওয়ায় বর্ষাকালে যেন পানি না দাঁড়ায় সেজন্য একটু গভীর করে ঘন ঘন নালা তৈরি করতে হয়। জমির আকৃতি-প্রকৃতি অনুসারে নালার ব্যবধান ১২ মিটার থেকে ১৮ মিটার, নালার প্রস্থ ০.৫ মিটার থেকে ১.৫ মিটার এবং গভীরতা ০.৫ মিটার থেকে ১.৫ মিটার হতে পারে।

চারা রোপণ: বিভিন্ন পদ্ধতিতে চা চারা রোপণ করা হয়ে থাকে যথা- একক সারি পদ্ধতি (single hedge row) ও দ্বৈত সারি পদ্ধতি (double hedge row)। এছারাও চারা রোপণে, সুবিধা অনুযায়ী আয়তাকার পদ্ধতি (rectangular system) বা ত্রিকোণাকার পদ্ধতি (tri-angular system) অনুসরণ করা হয়ে থাকে। সাধারণত সমতল ভূমিতে চা চারা রোপণে আয়তাকার পদ্ধতি এবং টিলাতে ত্রিকোণাকার পদ্ধতি বেশি উপযোগী। টিলাতে ত্রিকোণাকার পদ্ধতিতে রোপণের ফলে বর্ষার সময় ভূমি ক্ষয় অনেকটা কম হয়।

রোপণ সারিঃ

একক সারি প্রণালীঃ টিলার ক্ষেত্রে সারি থেকে সারি ৯০ সেমি (৩.০ ফুট) ও চারা থেকে চারা ৬০ সেমি (২ ফুট)। এতে হেক্টর প্রতি ১৮,৫১৮টি গাছ লাগবে। সমতম ভুমিতে সারি থেকে সারি ১০৭ সেমি (৩.৫ ফুট) ও চারা থেকে চারা ৬০ সেমি (২ ফুট)। এতে হেক্টর প্রতি ১৫,৫৭৬ টি গাছ লাগবে।

দ্বৈত সারি প্রণালীঃ সারি থেকে সারি ১০৭ সেমি (৩.৫ ফুট), হেজ থেকে হেজ ৬০ সেমি (২.০ ফুট) ও চারা থেকে চারা ৬০ সেমি (২.০ ফুট)। এতে হেক্টর প্রতি ১৯,৯৬০টি গাছ লাগবে।

চা বাগানে চা’র ফলন (কেজি/হেঃ) কেমন হবে তা বহুলাংশে নির্ভর করে ঐ বাগানে হেক্টর প্রতি কত চা গাছ আছে তার ওপর। গবেষণায় দেখা গেছে, চা’র ভাল ফলন পাওয়ার জন্য প্রতি হেক্টরে ১৫,০০০ চা গাছ থাকা উচিত, হেক্টর প্রতি চা গাছের সংখ্যা ১৩,০০০-এর কম হলে ফলন কমতে থাকে। আবার রোপণের সময় বেশি ঘন করে লাগালে পূর্ণ বয়স্ক চা গাছে আলো-বাতাস-খাদ্যাপাদান নিয়ে অত্যাধিক প্রতিযোগিতার কারণে ফলন কমে যায়। পরীক্ষায় দেখা গেছে, হেক্টর প্রতি ১৯,০০০-এর বেশি চা গাছ থাকলে সেখানে ফলন কমে যায়। অন্যদিকে, পুরনো চা আবাদি জমিতে দেখা যায় সেখানে অত্যন্ত দীর্ঘ স্প্যাসিং দিয়ে চা চারা রোপণ করা হয়েছিল, ভ্যাকান্সি অনেক বেশি যার দরুন হেক্টর প্রতি ৮,০০০ টি চা গাছও চোখে পরেনা ফলশ্রুতিতে চা’র ফলন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম হয়।

চারা রোপনের সময়ঃ এপ্রিল/মে মাসে প্রাক-বর্ষাকালীন সময়ে চা চারা রোপণ করাই ভাল। তবে যদি সেচের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায় তাহলে ডিসেম্বর/মার্চ মাসেও চারা রোপণ করা যায়। ডিসেম্বর হতে মার্চ, এই সময়ের মাঝে রোপণকে শীতকালীন রোপণ বলে (winter planting)। আবার, সেচের ব্যবস্থা না থাকলে বর্ষা শুরুর প্রারম্ভে চা চারা রোপণ করা উত্তম। একে প্রাক-বর্ষাকালীন রোপণ বলে (early-monsoon planting)। সাধারনভাবে এপ্রিল-মে মাস এই সময়ের মধ্যে পরে। পূর্ণ বর্ষার সময় চা চারা রোপণের কাজ পরিহার করা হয় কারণ ঐ সময় রোপণ করে দেখা গেছে চারা মৃত্যুর হার তুলনামূলক বেশি হয়।

চারা রোপন পদ্ধতিঃ চা চারা সারিতে, নির্দিষ্ট দূরত্বে রোপণ করা হয়। যেন এলোমেলো না হয়, সেজন্য চারা রোপণের পূর্বে স্ট্যাকিং করে নিতে হয়। চারা লাগানোর নির্দিষ্ট স্থানে স্থানে সঠিক মাপের গর্ত করে নিতে হয়। ক্লোন চারার জন্য গর্তের মাপ (গভীরতা ৩০-৩৫ সে.মি এবং প্রশস্ততা ২৫-৩০ সে.মি) আর বীজের চারার জন্য গর্তের মাপ (গভীরতা ৪০-৪৫ সে.মি এবং প্রশস্ততা ২৫-৩০ সে.মি) ভিন্ন হয়ে থাকে। কারণ বীজের চারায় প্রধান মূল থাকে যা মাটির অনেক গভীরে প্রবেশ করে কিন্তু ক্লোন চারায় ইহা থাকেনা।

গর্ত তৈরির সময় খেয়াল করে উপরের মাটি (০-২০ সে.মি) আলাদা করে একপাশে রাখতে হয় কারণ ইহা অপেক্ষাকৃত উর্বর মাটি। এবং নিচের মাটিটা অন্যপাশে রাখতে হয়। উপরের মাটির সাথে ২ কেজি পচা গোবর সার, ৩০ গ্রাম টিএসপি ও ১৫ গ্রাম এমওপি সার ভালোভাবে মিশিয়ে গর্তের তলায় দিতে হবে। অতঃপর চারা বসিয়ে গর্তের বাঁকি অংশ প্রথমে সার মেশানো অবশিষ্ট মাটি দিয়ে ভরাট করতে হবে তারপর গর্তের আলাদা করা নিচের মাটি উপরিভাগে দিয়ে গর্ত ভালোভাবে ভরাট করে র‍্যামিং করে দিতে হবে।

চা চারা রোপণে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়ঃ

(১) সঠিক বয়সের (আনুমানিক ১৪ মাস) এবং সুস্থ চারা মূল জমিতে রোপণ করতে হবে। এখানে বলা যায়, রোপণের জন্য আদর্শ চা চারার কাণ্ডের ডায়ামিটার হবে পেন্সিলের মত মোটা, চারাটি হবে ১৫-২০ টি পাতা সম্পন্ন এবং ৪০-৫০ সে.মি উচ্চতা বিশিষ্ট।
(২) খেয়াল রাখতে হবে চারা রোপণের জন্য পরিবহণের সময়, গর্তে রোপণের সময় অথবা র‍্যামিং করার সময় চারার পিণ্ডিতে আঘাত না লাগে এবং উহা যেন ভেঙ্গে না যায়। কারন পিণ্ডি ভেঙ্গে গেলে চারার শিকড় যুক্ত মাটি হতে আলগা হয়ে পরে এবং চারা মারা যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।
(৩) গর্তে চারা বসানোর সময় খেয়াল রাখতে হবে যাতে চারার গোঁড়া ভূমি-তল হতে একটু উপরে থাকে এবং মাটি বসে গেলে তা যেন ভূমি-তলের সমান হয়ে যায়। অন্যদিকে, চারার গোঁড়া ভূমি-তল হতে নিচু হলে সেখানে বর্ষাকালে পানি জমে থাকে এতে অনেকক্ষেত্রেই শিকড় পচে যায় এবং চা চারা মারা যায়।
(৪) চারা রোপণের পর আলগা মাটি এবং মাটির রস সংরক্ষণের জন্য চারার গোঁড়া হতে ৭-১০ সে.মি দূরে এবং ৮-১০ সে.মি পুরু করে মালচ দেওয়া ভাল। মালচ হিসাবে কচুরিপানা, গুয়াতেমালা ও সাইট্রোনেলা ঘাস, এমনকি ঝোপ-জঙ্গল কেটে এনে বিছিয়ে দেওয়া যেতে পারে।

টিপিং ও প্লাকিং

টিপিং

একটি পূর্ণ বয়স্ক চা গাছ হতে চা উৎপাদনে প্রুনিং এবং টিপিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে যা প্লাকিং তথা পরবর্তীতে চা’র মান এবং ফলনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে; উপরোক্ত তিনটি কৃষিতাত্ত্বিক পরিচর্যা প্রায় একই সূত্রে গাঁথা। চা গাছ শতবর্ষের অধিককাল বাঁচলেও অনুকূল পরিবেশে একটি চা গাছ হতে বাণিজ্যিকভাবে ৫০ বছর পর্যন্ত লাভজনকভাবে পাতা চয়ন করা যায়, এরপর গাছ উৎপাদনক্ষম থাকলেও আর লাভজনক থাকেনা। এজন্য তখন পুরনো আবাদির চা গাছগুলো উপড়ে ফেলে (uprooting) নতুন করে আবাদি (replantation) করাই উত্তম। চা গাছ হতে যে পদ্ধতি/প্রক্রিয়ায় পাতা উত্তোলনের কাজটি করা হয়ে থাকে, তাকে প্লাকিং বলা হয়। আর টিপিং হল প্লাকিং-এর প্রস্তুতিমূলক প্রাথমিক ধাপ। এই দু’টি কারয্যক্রমের ভিত্তি যদিও পাতা আহরণ করা তবুও উদ্দেশ্যের উপর ভিত্তি করে টিপিং ও প্লাকিং-এর মধ্যে বিশেষ পার্থক্য বিদ্যমান।

প্রুনিং-এর পর চা গাছে নতুন আসা কচি ডগা/কুশীগুলোকে (shoots) একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় ভেঙ্গে তথা এলাউন্স দিয়ে পাতা আহরণের কার্যক্রমকে টিপিং বলা হয়। টিপিং-এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, চা গাছের একটি সুবিধাজনক উচ্চতায় বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্লাকিং টেবিল গঠন করা। টিপিং-এর সময় কততুকু চা পাতা চয়িত হল তা একটি গৌণ বিষয়, এই সময় মুখ্য বিষয় হচ্ছে চা গাছকে একটি স্বাস্থ্যসম্মত রূপ/আকার প্রদান করা যাতে ওখান হতে দীর্ঘ দিন ধরে এবং সর্বচ্চো পরিমাণের পাতা সংগ্রহ করা যায়। টিপিং-এর সময় টিপিং এলাউন্স হিসাবে চা গাছে কিছু পাতা রেখে দেওয়া / যোগ করার উদ্যেশ্য হল সালোকসংস্লেশনের মাধ্যমে ঐ পাতাগুলো পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন করবে যা গাছের বৃদ্ধি এবং উৎপাদন ত্বরান্বিত করবে। এজন্য টিপিং এলাউন্স হিসাবে চা গাছে রেখে দেওয়া পাতাকে মেইনটিনেন্স লিফ (maintenance leaves) বা মাতৃ গাছের যত্ন গ্রহণকারী পাতা নামে অবিহিত করা হয়। মেইনটিনেন্স লিফ চা গাছে পরিমাণমত না থাকলে খাদ্য উৎপাদন ঠিকভাবে হবেনা যা গাছের বৃদ্ধি এবং উৎপাদনে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, চা গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও সর্বচ্চো উৎপাদন পাওয়ার জন্য মেইনটিনেন্স লিফের লেয়ার ২০ সেমি. (৮ ইঞ্চি) হতে হবে।

প্লাকিং

চা তৈরীর লক্ষ্যে চা গাছ হতে পাতা সংগ্রহকে পাতা চয়ন বা প্লাকিং (Plucking) বলা হয়। চা পাতা সংগ্রহে কিছু বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যেমন- প্লাকিং পদ্ধতি (হাত দ্বারা অথবা যান্ত্রিক উপায়ে), প্লাকিং স্ট্যান্ডার্ড (fine, medium and coarse), প্লাকিং প্রকটতা (mother-leaf plucking, fish-leaf plucking and janam-leaf plucking) এবং প্লাকিং রাউন্ড। এই বিষয়গুলো জলবায়ুগত কারণ, তৈরী চা’র ধরণ এবং শ্রমিক পর্যাপ্ততার উপর বহুলাংশে নির্ভর করে। প্রকৃতপক্ষে, চা পাতা চয়নের সবচেয়ে ভাল সিস্টেম সেটাকেই বিবেচনা করা হয় যার মাধ্যমে অল্প খরচে সর্বচ্চো ফলন পাওয়া যায়, তৈরী চা’র মান ভাল হয় এবং চা গাছেরও কোনরূপ ক্ষতি হয়না।

চয়ন করা কুশিতে দুটি পাতা থাকলে তাকে বলা হয় ফাইন প্লাকিং (fine plucking), তিনটি পাতা থাকলে তাকে বলা হয় মিডিয়াম প্লাকিং (medium plucking)। চয়ন করা কুশিতে তিনটির অধিক পাতা থাকলে এবং বয়স্ক পাতা থাকলে তাকে বলা হয় কোরজ্ প্লাকিং (coarse plucking)। তিন পাতার বেশী হলেই চতুর্থ পাতা এবং সংশ্লিষ্ট কাণ্ডে আঁশের (fibre) পরিমাণ বেড়ে যায় যা দ্বারা ভালমানের চা তৈরী করা যায়না। চয়নকৃত কুশিতে বয়স্ক পাতা, বড় পাতা থাকলে তাকে sub-standard অথবা bad leaf হিসাবে গণ্য করা হয়। ভালমানের চা তৈরী করার জন্য প্রয়োজন ২-৩ পাতাযুক্ত কচি কুশি চয়ন এবং কোনরূপ ক্ষতি ছাড়াই প্রক্রিয়াজাত করার জন্য দ্রুত তা কারখানায় প্রেরণ। এধরণের পাতাকে বলা হয় standard অথবা good leaf। চয়নকৃত চা পাতার ভিতর ৭৫-৮০% স্ট্যান্ডার্ড পাতা থাকলেই তা দ্বারা ভাল মানের চা তৈরী করা যায়। সম্পূর্ণরূপে ফাইন প্লাকিং-এ খুব ভাল মানের চা তৈরী হলেও এতে চা আবাদীর ফলন কমে যায়, শ্রমিক তুলনামূলকভাবে কম পরিমাণ পাতা চয়ন করতে পারে এতে খরচ বেড়ে যায়। এজন্য আবাদী জমি হতে চা পাতা চয়নের জন্য মিডিয়াম প্লাকিং অনুসরণ করতে বলা হয়, যার মাধ্যমে স্বল্প খরচে তুলনামূলক বেশী ও ভাল মানের চা পাওয়া যায়।

প্র“নিং করার পর মার্চ মাসের শেষে অথবা এপ্রিলে চায়ের শাখা থেকে কচি কচি শাখা ও পাতা (কিশলয়) গজায়। এ কচি ডগাগুলি নির্দিষ্ট উচ্চতায় প্রথম টিপিং করা হয়। এভাবে একটি চয়ন টেবিল প্রতিষ্ঠা করে পরে সপ্তাহ অন্তর অন্তর পাতা তোলা হয়। ৭-৮ দিন অন্তর অন্তর চা পাতা চয়ন করতে হয়।

প্রুনিং বা ছাঁটাইকরণ

চা গাছ ছাঁটাই এর সময় ও পদ্ধতি: চা গাছ রোপনের পর থেকে ৫ বছর পর্যন্ত চা গাছকে অপ্রাপ্ত বয়স্ক বা অপরিণত চা গাছ হিসেবে গণ্য করা হয়। অপরিণত চা গাছের ছাঁটাইয়ের উদ্দেশ্য হল গাছটিকে ঝোপাকৃতি করা। যত বেশী ঝোপন শাখা-প্রশাখা বেশী হবে তত বেশী পাতা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যদি চা গাছ এপ্রিল/মে মাসে রোপণ করা হয় তবে পরের বৎসর জানুয়ারি মাসের শেষে অথবা ফেব্র“য়ারি মাসে ১ম সপ্তাহে ছাঁটাই করতে হবে। বিভিন্ন পদ্ধতিতে অপরিণত চা গাছ ছাঁটাই করা হয়, যেমন- মধ্যকান্ডচ্ছেদন, ভঙ্গন, বক্রন/বাহুবদ্ধকরণ ইত্যাদি।

অপরিণত চা গাছ ছাঁটাই এর জন্য ভূমি থেকে উচ্চতাঃ

পরিণত চা গাছ ছাঁটাই: পরিণত চা গাছ ছাঁটাই এর উদ্দেশ্য হল ফলনকালে গাছকে সবসময় সজীব ও পত্রময় এবং সীমিত উচ্চতায় রাখা। অবস্থাভেদে চা গাছের ছাঁটাই চক্র ত্রিবার্ষিক অথবা চতুর্বার্ষিক হতে পারে।
ত্রিবার্ষিক চক্র = লাইট প্র“নিং → লাইট স্কীফ→ ডীপ স্কীফ
চতুর্বার্ষিক চক্র = লাইট প্র“নিং → ডীপ স্কীফ → মিডিয়াম স্কীফ → লাইট স্কীফ

শুধুমাত্র চরম খরাপ্রবণ এলাকা ছাড়া আজকাল ত্রিবার্ষিক চক্রের প্রচলন নেই বললেই চলে। চতুর্বার্ষিকচক্র পদ্ধতিতে প্রথম চক্রের প্রথম বৎসর অর্থাৎ ৬ষ্ঠ বৎসরে লাইট প্রুনিং ৫৫ সে.মি. (২২ ইঞ্চি) উচ্চতায় প্রুনিং বা ছাঁটাই করার পর যে শাখা প্রশাখা গজাবে ঐগুলিকে প্রুনিং মার্ক বা ছাঁটাই চিহ্ন থেকে ২০ সে.মি. উচ্চতায় টিপিং করতে হবে। ৭ম বৎসরে ডীপ স্কীফ ৬৫ সে.মি. এবং ৭৫ সে.মি. পাতা চয়ন করতে হবে। ৮ম বৎসরে মিডিয়াম স্কীফ ৭০ সে.মি. করে ৭৫ সে.মি. এ পাতা চয়ন করতে হবে এবং ৯ম বৎসরে ৭৫ সে.মি. লাইট স্কীফ করে ৭৭.৫ সে.মি. উচ্চতায় পাতা চয়ন করতে হবে। এভাবে একটি চতুর্বার্ষিকচক্র শেষ হলে দ্বিতীয় চতুর্বার্ষিকচক্র শুরু হয়।

পরিণত চা গাছ ছাঁটাই এর সময়ঃ

লাইট প্রুনিং (এলপি) – ডিসেম্বরের ১ম সপ্তাহ থেকে ডিসেম্বর শেষ সপ্তাহ।

ডীপ স্কীফ (ডিএসকে) – জানুয়ারির ১ম সপ্তাহ থেকে জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ

মিডিয়াম স্কীফ (এমএসকে) – জানুয়ারির মাঝামাঝি থেকে ফেব্রুয়ারির ১ম সপ্তাহ

লাইট স্কীফ (এলএসকে) – জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে ফেব্রুয়ারি পুরো মাস

মিডিয়াম প্রুন (এমপি) – চক্র শুরুর ২৪ থেকে ৩০ বৎসরের মধ্যে একবার এবং অনুরুপভাবে ৫০ বৎসরের কাছাকাছি সময়ে এ ধরণের প্রুনিং আরেকবার প্রয়োজন হতে পারে।

ছায়াগাছ ব্যবস্থাপনা

ছায়াগাছ রোপন ও প্রতিপালন: চা গাছ অত্যধিক সূর্যতাপ সহ্য করতে পারে না। তাই বাংলাদেশের আবহাওয়ায় ছায়া একটি অপরিহার্য প্রয়োজন। এ ছায়া পদ্ধতিতে আপতিত সূর্যকিরণের শতকরা ৫০-৭০ ভাগ চা গাছের উপর পতিত হওয়া জরুরী। সে জন্যে চা গাছ রোপণের সাথে সাথে ছায়া গাছও রোপণ করা প্রয়োজন। চা বাগানে সাধারণত অস্থায়ী ছায়া হিসেবে বগামেডুলা, ক্রোটালারিয়া ও ইন্ডিগুফেরা এবং স্থায়ী ছায়া হিসেবে কালশিরিষ, শীলকড়ই ও লোহাশিরিষ গাছ লাগানো হয়ে থাকে।

চা চাষের জন্য উপযুক্ত তাপমাত্রা হল ২৫০সে.-এর কাছাকাছি, বাতাসে আপেক্ষিক আদ্রতার পরিমাণ ৭০-৯০% -এর মধ্যে এবং সারাবছর সমভাবে বৃষ্টিপাত অধ্যুষিত উঁচু এলাকা চা’র জন্য উপযোগী। কিন্তু ভৌগলিক অবস্থানের কারনে বাংলাদেশ ক্রান্তীয় অঞ্চলে হওয়ায় এখানকার আবহাওয়া চরমভাবাপন্ন অর্থাৎ একেক ঋতুতে একেক ধরণের আবহাওয়া বিরাজ করে। দেখা যায়, গ্রীষ্মকালে কোন কোন সময় তাপমাত্রা ৪০০সে. –এর উপরে চলে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, বাতাসের তাপমাত্রা ৩৫০সে. –এর উপরে গেলেই চা গাছের পাতার কোষে ক্ষতি হয় এবং ফলনে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটে। চা ছায়া পছন্দকারি ফসল, ছায়াগাছের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয়ে যদি পূর্ণ সূর্যালোকের ৬০% আলো চা গাছে পতিত হয় তা সবচেয়ে বেশি কার্যকরী হয়। চা উৎপাদনকারী অনেক দেশেই ছায়াগাছ তেমন প্রয়োজন হয়না বা হলেও খুব কম (যেমন, কেনিয়া, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ ভারতের কিছু এলাকা) কারণ সেখানে অনেক উচ্চতায় চা চাষ করা হয় (>১কি.মি.) যার দরুন তাপমাত্রা প্রায় সবসময়ই একই থাকে এবং তা ২০০সে. –এর কাছাকাছি। কিন্তু আমাদের দেশে চা আবাদি এলাকা সমুদ্র সমতল হতে সামান্য উচ্চতায় অবস্থিত হওয়ায় (<১০০ ফুট) এখানে তাপমাত্রা খুব উচ্চ হয়। চা চাষের জন্য সুবিধাজনক আবহাওয়া সৃষ্টির লক্ষ্যে চা আবাদিতে সঠিক নিয়মে ছায়াগাছ রোপণ এবং ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত প্রয়োজন। গবেষণার রিপোর্ট হতে দেখা যায়, সঠিক ছায়াগাছ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রখর সূর্যালোকের দিনে চা গাছের উপর তাপমাত্রা ১০০সে. কমে রাখা যায়। ছায়াগাছ চা আবাদি এলাকার তাপমাত্রাকে কমিয়ে রাখার পাশাপাশি মাটি থেকে পানির বাষ্পীভবন হ্রাস করে এবং খরার প্রকোপ কমায়। এছারাও মাটির আদ্রতা ও জৈব পদার্থ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। চা আবাদিতে তিন স্তরে ছায়া ব্যবস্থাপনা করা হয়ে থাকে যথা- অস্থায়ী ছায়াগাছ (temporary shade tree), মাধ্যমিক/সাময়িক ছায়াগাছ (intermediate/ semi-permanent shade tree) ও স্থায়ী ছায়াগাছ (permanent shade tree) রোপণ এবং পরিচর্যার মাধ্যমে। জমিতে তিন প্রকার ছায়াগাছ একসাথেই লাগানো দড়কার। অস্থায়ী ছায়াগাছ চা গাছে ১.৫-২ বছর ছায়া দিয়ে থাকে, সাময়িক ছায়াগাছ ৬-৭ বছর পর্যন্ত এবং স্থায়ী ছায়াগাছ দীর্ঘ দিন (২০-৩০ বছর) ছায়া দিয়ে থাকে। অস্থায়ী ছায়াগাছ হিসাবে বগামেডুলা (Tephrosia candida) ও ক্রোটোলারিয়া (Crotalaria anagyroides) ব্যবহার করা হয়। সমতল ভূমিতে প্রতি দুই লাইন চা এর অন্তর বুনতে হয় আর দক্ষিণ ও পশ্চিম টিলা বা পাহাড়ের ঢালে প্রতি চায়ের লাইনের মধ্যে অস্থায়ী ছায়াগাছের বীজ বুনতে হয়। এরা দ্রুত বর্ধনশীল বলে চা চারাকে দ্রুত ছায়া প্রদান করে থাকে। বর্ষাকালে এদেরকে প্রয়োজনমত ছাঁটাই (lopping) করে ছায়ার ঘনত্ব কমাতে হয়। লোপিং করা অংশ চা গাছের লাইনের মাঝে মালচের মত দিয়ে রাখলে তা মাটির রস সংরক্ষনের সাথে সাথে জৈব পদার্থ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। মাধ্যমিক/সাময়িক ছায়াগাছ হিসাবে আমাদের দেশে ইন্ডিগোফেরা (Indigofera teysmanii) ব্যবহার করা হয় কিন্তু চা উৎপাদনকারী অনেক দেশেই বিশেষত নিরক্ষীয় অঞ্চলে গ্লিরিসিডিইয়া (Glyricidia sepium) খুবই ভাল মানের একটি মাধ্যমিক ছায়াগাছ। ইন্ডিগোফেরার বীজ হতে উৎপাদিত চারা মূল জমিতে ৩ মিটার X ৩ মিটার দূরে দূরে গর্ত করে লাগাতে হয় এবং ১.৫-২ বছরের মধ্যেই ইহা ছায়া প্রদানের উপযোগী হয়ে ওঠে। এবং তখন সঠিক ব্যবস্থাপনায় অস্থায়ী ছায়াগাছগুলোকে আবাদি হতে উঠে নিতে হয়। চা বাগানে স্থায়ী ছায়াগাছ হিসাবে আমাদের দেশে সাধারণত অডিট (Albizia odoratissima), লেবেক (Albizia lebbek), ডেরিস (Derris robusta) ব্যবহার করা হয়। এছাড়া বর্তমানে কিছু কিছু বাগানে জাতি নীম (Azadirachta indica) ও গোরা নীম (Melia azedarach) লাগানো হচ্ছে এবং এতেও ভাল ফল পাওয়া যাচ্ছে। বীজ হতে চারা উৎপাদন করে মূল আবাদি জমিতে নির্দিষ্ট দূরত্বে গর্ত করে রোপণ করতে হয়, যেমন সমতল আবাদিতে ও টিলার পূর্ব ঢালে ৬ মিটার X ৬ মিটার দূরে, টিলার দক্ষিন ও পশ্চিম ঢালে ৪.৫ মিটার X ৪.৫ মিটার দূরে এবং উত্তর ঢালে ৯ মিটার X ৯ মিটার দূরে দূরে স্থায়ী ছায়াগাছের চারা লাগাতে হয়। স্থায়ী ছায়াগাছের চারা ধীরে বাড়ে এবং চা গাছকে কার্যকরভাবে ছায়া দিতে ৭-৮ বছর সময় লেগে যায়। ইহা চা গাছকে প্রয়োজনীয় ছায়া প্রদানে সক্ষমতা অর্জনের পর মাধ্যমিক/সাময়িক ছায়াগাছ সরিয়ে ফেলতে হয়। এভাবে চা আবাদিতে তিন স্তরে ছায়া ব্যবস্থাপনা করতে হয়। খরা ব্যবস্থাপনাঃ খরার কারনে চা উৎপাদন অনেকাংশে হ্রাস পেতে পারে। প্রথমে আসা যাক, খরা বলতে আমরা কি বুঝি? যখন মাটি হতে উদ্ভিদে পানি সরবরাহের পরিমান উদ্ভিদের স্বাভাবিক শরীরতাত্বিক কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় পানির তুলনায় কম হয় তখন আমরা এ অবস্থাকে খরা বলে থাকি। চা চাষের জন্য ২০০০ মিমি. এর উপরে বৃষ্টিপাত ও বাতাসে জলীয় বাস্পের পরিমান অর্থাৎ আদ্রতা ৭০-৯০% আদর্শ ধরা হয়। বাংলাদেশের আবহাওয়ায় চা বাগানসমুহে বর্ষার সময়ে পানির পর্যাপ্ততা এবং শুষ্ক মৌসুমে অর্থাৎ নভেম্বর থেকে এপ্রিল কখনও মে মাস পর্যন্ত বৃষ্টি না হওয়ায় পানির ঘাটতি দেখা দেয়। এ সময় চা গাছ প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহ করতে পারে না। খরার কারনে প্রস্বেদনের মাধ্যমে যেমন গাছের উপরিভাগ হতে পানি হ্রাস পায় তেমনি বাস্পীভবনের মাধ্যমে মাটির উপরিভাগ হতেও পানি বাস্পীভূত হয়। অর্থাৎ এ সময়ে খরার প্রভাবে চা গাছ নিস্তেজ হয়ে পড়ে। এক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, প্রতি ১০০ সেমি. চা গাছের উপরিভাগ হতে ঘন্টায় গড়ে প্রায় ১.১৫ গ্রাম পানি বাষ্পীভূত হয়ে যায়। খরার প্রভাবঃ খরায় চা গাছ হতে নতুন কুড়ি বের হয় না। গাছের পাতাগুলো নেতিয়ে পড়ে। পানির স্বল্পতায় চা গাছ মারা যেতে শুরু করে। খরায় আক্রান্ত চা গাছ সমুহে চায়ের কতিপয় রোগবালাই ও পোকা মাকড়ের উপদ্রবও বেশি দেখা যায়। বিশেষকরে লাল মরিচা রোগ, লাল মাকড়, উইপোকা ও থ্রিপ্স এর আক্রমন বেশি দেখা যায়। তার মধ্যে লাল মাকড়ের উপদ্রব সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। নতুন, অপরিণত চা আবাদী ও স্কীফ সেকশন খরায় বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে। তাই অছাটাইকৃত গাছ বা স্কীফ সেকশনের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। খরা ব্যবস্থাপনাঃ চায়ের খরা মোকাবেলায় সেচই একমাত্র ও সর্বোত্তম ব্যাবস্থাপনা। তাই খরা মোকাবেলায় কৃত্রিম উপায়ে সেচের ব্যাবস্থা করতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয় যদি স্প্রিংকলার সেচের ব্যাবস্থা করা যায়। এতে খরা মোকাবিলার সাথে সাথে লাল মাকড়ের উপদ্রবও যথেষ্ট কমে যাবে। মিউরিয়েট অব পটাশ (এমওপি) সার চা গাছের পাতায় উপরিপ্রয়োগ খরা মোকাবিলায় বেশ সহায়ক। সেজন্য ২% মিউরিয়েট অব পটাশের দ্রবণ ১৫ দিন অন্তর অন্তর সিঞ্চণ করতে হবে। এতে চা গাছের প্রস্বেদন প্রক্রিয়াকে হ্রাস করে পানির অপচয় রোধ করে সেই সাথে এমওপি প্রয়োগে সেকশনে লাল মাকড়ের সংখ্যাও কমে যাবে। পর্যাপ্ত ছায়াগাছের ব্যাবস্থা করতে হবে। এতে সেকশন ঠান্ডা থাকবে, মাটির আদ্রতা সংরক্ষণ থাকবে। ফলশ্রুতিতে খরা মোকাবিলায় সহায়ক হবে। তাছাড়া পর্যাপ্ত ছায়াগাছ সম্পন্ন সেকশনে লাল মাকড়ের আক্রমনও কম হয়। সেজন্য খরা প্রবণ এলাকায় পর্যাপ্ত কড়ই প্রজাতির ছায়াগাছ লাগাতে হবে। সেকশন আগাছামুক্ত রাখতে হবে। কারণ আগাছা মাটি হতে প্রয়োজনীয় পানি শোষণ করে নেয় যা খরাকে আরও ত্বরান্বিত করে। আবার আগাছা যেহেতু লাল মাকড়ের পোষক গাছ হিসেবে কাজ করে তাই আগাছা ধ্বংসের মাধ্যমে লাল মাকড়ের উপদ্রবও হ্রাস পায়। মাটিতে পর্যাপ্ত জৈব পদার্থ প্রয়োগ করতে হবে। অপরিণত চা আবাদীতে পর্যাপ্ত মালচিং এর ব্যবস্থা করতে হবে। জলাবদ্ধতাঃ চা একটি বৃষ্টি নির্ভর ফসল। চা গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য মাটিতে পরিমাণমত পানি থাকা অত্যাবশ্যক। অন্যদিকে, মাটিতে অতিমাত্রায় পানি চা গাছের জন্য ক্ষতিকর এমনকি গাছের মৃত্যুরও কারণ হতে পারে। মাটিতে অতিমাত্রায় পানি থাকার অবস্থাকে জলাবদ্ধতা (waterlog) বলা হয়। বর্ষাকালে যখন অধিক বৃষ্টিপাত হয় তখন নিম্ন-সমতল চা আবাদিতে জলাবদ্ধতা লক্ষ্য করা যায়। তাছাড়া মাটির বুনট ভারী তথা কর্দম প্রকৃতির হলে সেখানেও জলাবদ্ধতা দেখা যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমাদের দেশে কখনও কখনও অনাবৃষ্টির কারণে খরার প্রকোপতা যেমন দেখা দেয় তেমনি অতিবৃষ্টির কারণে নিম্ন-সমতল ভূমিতে জলাবদ্ধতাও দেখা যায়। বর্ষা মৌসুমে নার্সারি, অপরিণত ও পরিণত চা আবাদীতে জলাবদ্ধতা দেখা যায়। জলাবদ্ধতার প্রভাবঃ জলাবদ্ধতার কারণে গাছের বৃদ্ধি ও বিকাশ কমে যায় এবং নতুন কুশি বের হয় না। গাছের শিকড়ের বৃদ্ধি কমে যায়। ফলে গাছ দূর্বল হয়ে পড়ে। পাতা হলুদাভ হয়ে যায় ও অনেক সময় পাতা আস্তে আস্তে শুকিয়ে ঝরে পড়ে। এর ব্যাপকতায় আক্রান্ত গাছের সব পাতা ঝরে যায় ও কান্ড কখনও কখনও ঝাড়ুর মত হয়ে যায়। ছত্রাকজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যায়, বিশেষ করে আগামরা (Die-back) রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। চায়ের উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটায়। ব্যবস্থাপনাঃ চারা রোপণের সময় চারার গোড়ার মাটিতে ঠিকমত দূরমুজ করতে হবে। নালা ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন করতে হবে যেন বর্ষা মৌসুমে পানি না জমে থাকে। যেকোন উপায়ে দাঁড়ানো পানি সরানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য জমির মাঝে বিদ্যমান ছোট ড্রেনগুলো আরেকটু গভীর ও পরিষ্কার করে দিতে হবে। সৃষ্ট জলাবদ্ধতার সমস্যাটি যেন স্থায়ী না হয় সেজন্য প্রয়োজনে প্রধান ড্রেন ও আউটফল আরও গভীর করতে হবে। নালায় অতিরিক্ত আগাছা জন্মালে তা ছেঁচে পরিষ্কার করতে হবে। জলাবদ্ধতা উপদ্রুত স্থানে অনুমোদিত সিস্টেমিক ছত্রাকনাশক যেমন- নোইন পাতাসহ সম্পূর্ণ গাছ ভাল করে ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে। সূর্যতাপ জনিত পোড়া লক্ষণঃ নার্সারী, অপরিণত ও পরিণত আবাদী এলাকায় ছায়াগাছের অপ্রতলতা কিংবা বাচ্চা চারা হার্ডেনিং না করার ফলে চা গাছের পাতা ও ডালে প্রখর সূর্য তাপে লালচে বাদামী রঙয়ের ক্ষত তৈরি হয়। এটিকে সূর্যতাপ জনিত পোড়া বলা হয়। প্রতিকারঃ নার্সারী কিংবা চা আবাদী এলাকায় (অপরিনত/পরিণত) পর্যাপ্ত ছায়ার ব্যবস্থা করতে হবে। চারা রোপণের পুর্বে সঠিকভাবে হার্ডেনিং করতে হবে। শিলাবৃষ্টিঃ বৈরি আবহাওয়া যেমন খরা, অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টি ইত্যাদি চায়ের উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। ফলে চায়ের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যহত হচ্ছে। শিলাবৃষ্টি একটি অন্যতম প্রাকৃতিক দুর্যোগ যা সরাসরি চায়ের উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটায়। প্রতিনিয়তই উত্তরবঙ্গসহ বিভিন্ন চা আবাদী এলাকা এই দুর্যোগ এর সম্মুখীন হচ্ছে। সাধারণত মার্চ-মে মাসে এই শিলাবৃষ্টির আবির্ভাব দেখা দেয়। দিন দিন এই শিলাবৃষ্টির প্রাদুর্ভাব বেড়েই চলছে। বাংলাদেশের চা আবাদীতে শিলাবৃষ্টির কারণে চা গাছের ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ছাটাইকৃত চা গাছ এবং বাচ্চা চা গাছ শিলাবৃষ্টিতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষকরে অপেক্ষাকৃত কম ছায়াগাছ বা ছায়াগাছ বিহীন চায়ের সেকশন শিলাবৃষ্টিতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ব্যাপক শিলাবৃষ্টিতে কখনও পুরো গাছটি পাতাবিহীন হয়ে পড়ে। শিলাবৃষ্টির সময় বাতাসের তাপমাত্রা উপর্যপুরি বেড়ে যায়। শিলাবৃষ্টির কারণে চা গাছের শাখা প্রশাখা কিংবা বাকল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিলাবৃষ্টি দ্বারা গাছের ক্ষতস্থানে ছত্রাকজনিত রোগের আক্রমন হতে পারে। বিশেষকরে ম্যাক্রোফোমা ছত্রাক জনিত ব্রাঞ্চ ক্যাংকার রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যেতে পারে। প্রতিকারঃ শিলাবৃষ্টিতে আক্রান্ত সেকশনের এক/দুই রাউন্ড পাতা চয়ন বন্ধ রাখতে হবে এবং শিলাবৃষ্টিতে ভেঙ্গে যাওয়া কিশলয় ও শাখা প্রশাখা সরিয়ে ফেলতে হবে। শিলাবৃষ্টিতে আক্রান্ত চা গাছ ৪৮ ঘন্টার মধ্যেই বিটিআরআই অনুমোদিত যে কোন কন্টাক্ট ছত্রাকনাশক যেমন কুপ্রাভিট অথবা সানভিট বা ইমিভিট ৫০ ডব্লিউপি @ ২.৮ কেজি হেক্টর প্রতি ১০০০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ভাল করে স্প্রে করে দিতে হবে। এতে শিলাবৃষ্টি দ্বারা গাছের ক্ষতস্থানে ছত্রাকজনিত রোগের আক্রমনকে প্রশমিত করবে। সিস্টেমিক ছত্রাকনাশক যেমন কার্বেন্ডাজিমও ব্যবহার করা যেতে পারে। পর্যবেক্ষনে দেখা যায় যে, সুবিন্যস্ত স্থায়ী ছায়াগাছ এলাকায় শিলাবৃষ্টি চা গাছের ক্ষতির মাত্রা অনেক কম। তাই স্থায়ীভাবে শিলাবৃষ্টি মোকাবেলায় /প্রতিরোধের জন্য চা আবাদীতে পর্যাপ্ত পরিমাণে সঠিক স্থায়ী ছায়াগাছ যেমন আলবিজিয়া অডোরাটিসিমা, আলবিজিয়া লেবেক, ডেরিস রোবাস্টা প্রজাতির ছায়াগাছ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। স্থায়ী ছায়াগাছ লাগাতে না পারলে গ্রীন ক্রপ জাতীয় গাছ যেমন ক্রোটালারিয়া গাছ লাগানো যেতে পারে।

Copyright © 2022 btbckaschool.com
Developed by BCSarker