1. admin@badalphoto.com : admin : Camellia Open Sky School

পঞ্চগড়সহ ৫ জেলায় চা আবাদে বদলে গেছে দৃশ্যপটঃ খুলে গেছে অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বর্ণদ্বার

এ রহমান মুকুল ॥ সমতলে চা আবাদ খুলে দিয়েছে অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বর্ণদ্বার। বদলে গেছে গ্রামীণ জনপদের দৃশ্যপট। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত দিক-নির্দেশনা ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে বাইশ বছর আগে পঞ্চগড়ের সমতল ভূমিতে শুরু হওয়া ক্ষুদ্রায়তনের চা আবাদ এখন উত্তরের কয়েকটি জেলায় সম্প্রসারিত হয়েছে। এ সময়ে শুধু পঞ্চগড়ের দৃশ্যপট পাল্টে যায়নি। পার্শ্ববর্তী ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও দিনাজপুর জেলার সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থাও পাল্টে গেছে। ইতোমধ্যে তৈরি চা (মেড টি) উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা দেড় কোটি কেজির কাছাকাছি পৌঁছেছে। এই চা উৎপাদন অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়েছে। সদ্যসমাপ্ত মৌসুমে ৫ জেলার সমতল ভূমিতে ১ কোটি ৪৫ লাখ ৪০ হাজার কেজি তৈরি চা (মেড টি) উৎপাদন হয়েছে, যা ২০২০ সালের মৌসুমের চেয়ে ৪২ লাখ ৪০ হাজার কেজি বেশি। চলতি ২০২২ সালের মৌসুমে দুই কোটি কেজি তৈরি চা (মেড টি) উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। অল্প খরচে বেশি লাভ পাওয়ায় এ অঞ্চলে চা আবাদে ঘটেছে নীরব বিপ্লব। ক্ষুদ্রায়তনের চা আবাদ করে উত্তরাঞ্চলের ৫ জেলার অনেকের ভাগ্য বদলে গেছে। ৪০ থেকে ৯০ শতাংশ জমিতে চা আবাদ করে অসংখ্য দিনমজুর পরিবারে ফিরে এসেছে সুখ-শান্তি। খড়ের ছাউনি আর বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা ঘর হয়েছে পাকা বাড়ি। বৈদ্যুতিক আলো জ¦লছে, চলছে এলইডি টিভি। সন্তানরা পড়ছে ভালো স্কুল-কলেজে। অথচ একসময় সন্তানদের ভালো স্কুলে পড়ানো ছিল দূর অস্ত, পরিবারগুলোকে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাতে হতো।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনায় ২০০০ সালের এপ্রিলে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় প্রথম সমতল ভূমিতে পরীক্ষামূলক চা আবাদ শুরু হয়। তৎকালীন জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ রবিউল ইসলাম স্থানীয় চাষী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের চা আবাদের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। প্রথম পর্যায়ে কয়েকজন ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি জমি কিনে চা আবাদ শুরু করেন। তাদের দেখাদেখি স্থানীয় চাষীরাও ক্ষুদ্রায়তনে চা আবাদ শুরু করায় পঞ্চগড়ে বাণিজ্যিকভাবে শুরু হয় চা আবাদ। এরপর চা আবাদের পরিধি বাড়তে বাড়তে পার্শ্ববর্তী ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, নীলফামারী ও লালমনিরহাট জেলায় সম্প্রসারিত হয়। বেড়ে যায় চায়ের উৎপাদন। এরসঙ্গে চা প্রক্রিয়াজাত কারখানার সংখ্যাও বাড়তে থাকে। বর্তমানে পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও জেলায় ২২টি চা প্রক্রিয়াজাত কারখানা রয়েছে। পঞ্চগড়সহ ৫ জেলায় উৎপাদিত কাঁচা চা পাতা থেকে তৈরি চা উৎপাদন করা হচ্ছে। এই কারখানাগুলো চা-চাষীদের কাছ থেকে সবুজ চা-পাতা ক্রয় করে তা থেকে তৈরি চা উৎপাদন করেন। চাহিদা অনুযায়ী এই কাঁচা চা পাতার দাম মাঝেমধ্যে বাড়ে আবার কমেও যায়। উত্তরাঞ্চলে উৎপাদিত তৈরি চায়ের এতদিন অকশন মার্কেট ছিল চট্টগ্রাম। সেখানে নিলামের মাধ্যমে চা বিক্রি করেন চা প্রক্রিয়াজাত কারখানা মালিকরা। করোনা পরিস্থিতিতেও অকশন মার্কেট খোলা থাকায় কারখানা মালিকরাও যেমন চায়ের ভালো দাম পেয়েছেন তেমনি চা চাষীরাও তাদের কাঁচা চা পাতার ন্যায্যমূল্য পেয়েছেন। তবে, আশার কথা- সামনের মৌসুমে উৎপাদিত তৈরি চায়ের অকশন মার্কেট পঞ্চগড়ে হচ্ছে মর্মে বাংলাদেশ চা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের পঞ্চগড় আঞ্চলিক অফিসের সূত্র মতে, এবারের মৌসুমে দেশে মোট ৯ কোটি ৬৫ লাখ ৬ হাজার কেজি তৈরি চা (মেড টি) উৎপাদিত হয়েছে। এরমধ্যে শুধু পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী ও লালমনিরহাট জেলায় ১ কোটি ৪৫ লাখ ৪০ হাজার কেজি তৈরি চা (মেড টি) উৎপাদিত হয়েছে। এর আগের বছর ২০২০ সালে ১ কোটি ৩ লাখ কেজি তৈরি চা উৎপাদন হয়। সূত্র মতে, উত্তরাঞ্চলে চা আবাদ সম্প্রসারণ এবং চায়ের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশ চা বোর্ড ‘নর্দান বাংলাদেশ প্রকল্প’ নামে একটি প্রকল্প হাতে নেয়। এই প্রকল্পের মাধ্যমে চা চাষীদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ, প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ প্রদান, স্বল্পমূল্যে উচ্চ ফলনশীল ও গুণগতমানের বিটি সিরিজের চারা সরবরাহ এবং নতুন করে চা আবাদে চাষীদের উদ্বুদ্ধ করার ফলে এই প্রকল্পের আওতায় ৫ জেলায় ১১ হাজার ৪৩৩ দশমিক ৯৪ একর জমিতে চা আবাদ হয়েছে। যা গতবছরের তুলনায় ১ হাজার ২৬৩ দশমিক ৩৭ একর বেশি জমিতে চা আবাদ হয়।

চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী উত্তরাঞ্চলে এখন পর্যন্ত ৪১টি চা প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা লাইসেন্স নিয়েছে। এরমধ্যে পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও লালমনিরহাট জেলায় ২২টি কারখানা চালু রয়েছে। এই কারখানাগুলো চা-চাষীদের কাছ থেকে সবুজ চা পাতা কিনে তা থেকে তৈরি চা (মেড টি) করে।

সূত্র মতে, ২০২১ সালে উত্তরবঙ্গের পাঁচ জেলায় ৯টি নিবন্ধিত বড় চা বাগান (পঞ্চগড় ৮টি, ঠাকুরগাঁও ১টি), ২১টি অনিবন্ধিত বড় চা বাগান (পঞ্চগড় ২০টি, ঠাকুরগাঁও ১টি) এবং ৮,০৬৭টি ক্ষুদ্রায়তন চা বাগান (পঞ্চগড় ৭,১৬৮টি, ঠাকুরগাঁও ৭২৮টি, লালমনিরহাট ৯৬টি, দিনাজপুর ৪০টি, নীলফামারী ২৫টি) (তন্মধ্যে চা বোর্ড নিবন্ধিত ১,৭৪৫টি) এর মোট ১১,৪৩৩.৯৪ একর (পঞ্চগড় ৯,৭৪৭.৮০ একর, ঠাকুরগাঁও ১৩৭০.৩০ একর, লালমনিরহাট ১৬৮.৮৮ একর, দিনাজপুর ৭৮.৩৭ একর, নীলফামারী ৬৮.৫৯ একর) জমিতে চা চাষ হয়েছে। উক্ত চা বাগানসমূহ থেকে ২০২১ সালে ৭,৩৫,৬৮,০০৯ কেজি (পঞ্চগড় ৬,২৩,৮৫,৯০৫ কেজি; ঠাকুরগাঁও ৯৫,৯২,১০০ কেজি; লালমনিরহাট ৬,২৯,৮৭৪ কেজি; দিনাজপুর ৫,৪৮,৫৯০ কেজি; নীলফামারী ৪,১১,৫৪০ কেজি) সবুজ চা পাতা উত্তোলন করা হয়েছে যা থেকে উত্তরাঞ্চলের ২২টি চলমান চা কারখানায় ১,৪৫,৪০,০০ কেজি (পঞ্চগড় ১,৪০,৫৪,১৩০ কেজি; ঠাকুরগাঁও ৪,৭৮,০১০ কেজি ও লালমনিরহাট ৭,৮৬০ কেজি) চা উৎপন্ন হয়েছে। বিগত বছরের তুলনায় উত্তরাঞ্চলে ২০২১ সালে চা আবাদি বৃদ্ধি পেয়েছে ১,২৬৩.৩৭ একর (১২.৪২%) ও তৈরি চা বেশি উৎপন্ন হয়েছে ৪২.২২ লক্ষ কেজি (৪০.৯৫%)। জাতীয় চা উৎপাদনে উত্তরাঞ্চলের অবদান ১৫% এবং অঞ্চলভিত্তিক চা উৎপাদনে দ্বিতীয়।

পঞ্চগড়ের চা’কে নিয়ে এটুআই কর্মসূচীর আওতায় বাংলাদেশ চা বোর্ড কর্তৃক ‘দুটি পাতা একটি কুড়ি’ নামে একটি এ্যাপস চালু করা হয়। এই এ্যাপসটির মাধ্যমে চা সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য ও পরামর্শ পাওয়া যাওয়ায় চা চাষীদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

পঞ্চগড় পৌর এলাকার রৌশনাবাগ এলাকার কামরুজ্জামান শাহানশাহ বলেন, আমি ৭ একর জমিতে চা আবাদ করেছি। গত কয়েকবছরের তুলনায় এবার চা পাতার উৎপাদন বেশি। এই ৭ একরে প্রতি রাউন্ডে চা পাতা পেয়েছি ১২ থেকে ১৫ হাজার কেজি। এভাবে ৬ রাউন্ড চা পাতা উত্তোলন করেছি। সদর উপজেলার মাগুরা বাহাদি পাড়া গ্রামের আজিজার রহমান ৭ একর জমিতে চা আবাদ করেছেন। তিনি এবার চা পাতার ন্যায্যমূল্য পাওয়ায় বেশ খুশি। একই এলাকার তরিকুল ইসলাম একসময় রাজমিস্ত্রির কাজ করত। তার ৯০ শতক জমিতে চা আবাদ করেছেন। এখন আর তিনি রাজমিস্ত্রির কাজ করেন না। নিজের বাগানের পরিচর্যা আর চা পাতা তুলে জীবিকা নির্বাহ করছেন। আগে কাজ না করলে উপোস থাকতে হতো, এখন তিনবেলা পেট পুড়ে খান।

বাংলাদেশ চা বোর্ড পঞ্চগড় আঞ্চলিক অফিস সূত্র আরও জানায়, নর্দান বাংলাদেশ প্রকল্প শুরু হওয়ার পর পঞ্চগড়সহ ৫ জেলায় চা আবাদের পরিধি বাড়তে শুরু করে। ওই বছরেই কাঁচা চা পাতা ১ কোটি ১৮ লাখ ৬২ হাজার কেজি উৎপাদন হয়। এ থেকে তৈরি চা (মেড টি) উৎপাদন হয় ২৫ লাখ ২১ হাজার ৯২১ কেজি। এর আগের বছর উৎপাদিত ৬৩ লাখ ২৭ হাজার ৪২৭ কেজি কাঁচা চা পাতা থেকে ১৪ লাখ ২০ হাজার ৪৬৭ কেজি তৈরি চা (মেড টি) উৎপাদন হয়। ২০১৬ সালে কাঁচা চা পাতা উৎপাদন হয় ১ কোটি ৭৪ লাখ ৫২ হাজার ৭৯৩ কেজি এবং তা থেকে তৈরি চা (মেড টি) উৎপাদন হয় ৩২ লাখ ৬ হাজার কেজি। ২০১৭ সালে কাঁচা চা পাতা উৎপাদন হয় ২ কোটি ৫১ লাখ ৫৬ হাজার ৮৬৯ কেজি এবং তা থেকে তৈরি চা (মেড টি) ৫৪ লাখ ৪৬ হাজার কেজি উৎপাদন হয়। ২০১৮ সালে কাঁচা চা পাতা ৪ কোটি ১৬ লাখ ২৮ হাজার ৯৮১ কেজি উৎপাদন হয় এবং তা থেকে তৈরি চা (মেড টি) উৎপাদন হয় ৮৪ লাখ ৬৭ হাজার কেজি। ২০১৯ সালে ৪ কোটি ৬৯ লাখ ২১ হাজার ৬৫১ কেজি কাঁচা চা পাতা উৎপাদন হয় এবং তা থেকে ৯৫ লাখ ৯৯ হাজার কেজি তৈরি চা (মেড টি) উৎপাদন হয়। ২০২০ সালে ৫ কোটি ১২ লাখ ৮৩ হাজার ৩৮৬ কেজি কাঁচা চা পাতা থেকে ১ কোটি ৩ লাখ কেজি তৈরি চা (মেড টি) উৎপাদন হয় এবং এ বছর ৭ কোটি ৩৫ লাখ ৬৮ হাজার কেজি সবুজ চা পাতা থেকে ১ কোটি ৪৫ লাখ ৪০ হাজার কেজি তৈরি চা (মেড টি) উৎপাদন হয়েছে বলে সূত্রটি জানায়।

চা বোর্ড পঞ্চগড় আঞ্চলিক অফিসের উর্ধতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ শামীম আল মামুন জনকণ্ঠকে বলেন, সমতল ভূমিতে চা আবাদের জন্য পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, নীলফামারী ও লালমনিরহাট অত্যন্ত সম্ভাবনাময় জেলা। সেজন্য আমরা চাষীদের বিভিন্ন সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে চা চাষে উদ্ধুদ্ধ করছি। এর আগে ২০১৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত আমরা চা বোর্ডের ‘নর্দান বাংলাদেশ প্রকল্প’ সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

তিনি আরও বলেন, পঞ্চগড়সহ ৫ জেলার বিভিন্ন এলাকায় ‘ক্যামেলিয়া খোলা আকাশ স্কুল’-এ হাতে-কলমে চা চাষের কলাকৌশল শেখানোর পাশাপাশি চাষীদের বিভিন্ন ধরনের সমস্যা সমাধানের ‘দুটি পাতা একটি কুড়িৎ নামে একটি মোবাইল এ্যাপস চালু করা হয়েছে। এছাড়াও পঞ্চগড় আঞ্চলিক কার্যালয়ে একটি পেস্ট ম্যানেজমেন্ট ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে চা বাগানে রোগবালাই ও পোকা দমনে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সহায়তা দেয়া হচ্ছে। এছাড়াও ক্ষুদ্র চা চাষীরা তাদের উৎপাদিত কাঁচা চা পাতার ন্যায্যমূল্য পাওয়ায় চা আবাদে উৎসাহিত হচ্ছেন। ফলে নতুন নতুন চা আবাদও বাড়ছে বলে তিনি দাবি করেন।

করোনাকালেও রেকর্ড চা উৎপাদন ॥ সঠিক ব্যবস্থাপনার ফলে করোনাকালেও ২০২১ সালে দেশের ১৬৭টি চা বাগান এবং ক্ষুদ্রায়তন চা বাগান থেকে রেকর্ড পরিমাণ মোট ৯৬.৫০৬ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে যা গতবছরের (২০২০) চেয়ে ১০.১১১ মিলিয়ন কেজি বেশি। এ বছর (২০২১) চায়ের উৎপাদন অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়েছে। পাশাপাশি শুধুমাত্র উত্তরাঞ্চলে সমতলের চা বাগান ও ক্ষুদ্র চা চাষ থেকেও এ বছর (২০২১) রেকর্ড পরিমাণ ১৪.৫৪ মিলিয়ন কেজি চা জাতীয় উৎপাদনে যুক্ত হয়েছে, যা গতবছর (২০২০) ১০.৩০ মিলিয়ন কেজি ছিল।

https://www.dailyjanakantha.com/

Copyright © 2022 btbckaschool.com
Developed by BCSarker